অনলাইন ডেস্ক:
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব কাঠামোয় রূপান্তর করা। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিএফসিসি) কার্নিভাল হলে আয়োজিত ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬ : জাতীয় নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রত্যাশা’ শীর্ষক খসড়া ইশতেহার উপস্থাপন সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। সংলাপটি আয়োজন করে প্রাপ্তি ও সংলাপ সহযোগীর সহায়তায় সিপিডি। খসড়া নাগরিক ইশতেহার উপস্থাপনকালে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল জাতির লক্ষ্য। তবে পাঁচ দশকের পথচলায় নানা উত্থান-পতন, আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে দেশ এগোলেও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন রয়ে গেছে অসম ও ভঙ্গুর। বিশেষ করে গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ফলে গভীর শাসন-সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈষম্য, বঞ্চনা ও সুশাসনের ঘাটতির পুঞ্জীভূত বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত সামনে আনে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। এটি ছিল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভয়-ভীতি ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও জোরালো প্রত্যাঘাত। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট উপলব্ধি জন্ম নেয়—এটাই সময় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। তিনি বলেন, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪—এই তিন সময়ের চেতনার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। বরং এগুলো সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিক প্রকাশ। আন্দোলন-পরবর্তী বাস্তবতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন—এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনী ইশতেহারে কি নাগরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে? রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো কি বাস্তবায়িত হবে? পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কারা অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কারা আবারও উপেক্ষিত থেকে যাবে? নাগরিক ইশতেহারের দাবিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, আঞ্চলিক পরামর্শ সভা, যুব কর্মশালা ও অনলাইন মতামত সংগ্রহের মাধ্যমে নাগরিকদের যে প্রত্যাশা উঠে এসেছে, তার মূল সুর একটাই—একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এসব প্রত্যাশা পরস্পরের পরিপূরক। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হবে। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে বৈষম্যকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের আহ্বান জানান। নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রচিন্তা ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থান পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সংলাপে জানান, অতীতের মতো হতাশা যেন ফিরে না আসে এবং চলমান সংস্কারের গতি যেন ব্যাহত না হয়—এই উপলব্ধি থেকেই নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের আটটি বিভাগে আঞ্চলিক পরামর্শ সভা, ১৫টি যুব কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে ৩৫ জেলার প্রায় দেড় হাজার অংশীজনের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের ১৫০টিরও বেশি সহযোগী সংগঠন যুক্ত ছিল।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
