পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের অবদান অসামান্য। কিম্ভূতকায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয় মুসলিম লীগ। দলটির জন্ম ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।
দুই
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মুসলমানের অবদান যেমন অবিস্মরণীয়, তেমন বাঙালির সঙ্গে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতারণারও দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অধিবাসী। কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান জিন্নাহ ছিলেন পশ্চিম অংশের। প্রথম প্রধানমন্ত্রীও করা হয় ভারত থেকে আসা মোহাজের লিয়াকত আলী খানকে। পাকিস্তানের রাজধানী করা হয় পশ্চিম অংশে। সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে সিনিয়র ও সুযোগ্য বাঙালি জেনারেলকে ডিঙিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান করা হয় জেনারেল আইয়ুব খানকে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট। পাট উৎপাদিত হতো বাংলাদেশে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হতো সেনাবাহিনীর পেছনে। অথচ সেনাবাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশের কম। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করলেও বাঙালি ছিল সব ক্ষেত্রে উপেক্ষার শিকার। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ ছিল বাংলাভাষী। অথচ মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুকে দেশটির রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাঙালি উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়ার দাবি জানালে গায়ের জোরে সে দাবি স্তব্ধ করার অপচেষ্টা চালান পাকিস্তানি শাসকরা। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকার সংবর্ধনা সভায় ঘোষণা করেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। স্বভাবতই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রেশ না কাটতেই বাংলাদেশের মানুষের মোহভঙ্গ হয়। তার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। ৩০৯ আসনের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগ জয়ী হয় মাত্র ৯টি আসনে। বাদবাকি আসনে জয়ী হয় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং তাদের মিত্র দলগুলো। বলা যায়, ওই নির্বাচনে পাকিস্তানি চেতনার কবর রচিত হয়। বাংলাদেশের মানুষের এ রায়কে ভালো চোখে দেখেননি পাকিস্তানি শাসকরা। নির্বাচনের পর শেরেবাংলার নেতৃত্বে পূর্ববাংলায় সরকার গঠিত হয়। মাত্র ৫৬ দিন পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদ বরখাস্ত করে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার ধৃষ্টতাও দেখান পাকিস্তানি শাসকরা।
তিন
বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের স্বাধীনতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানুষ হাজার হাজার বছর আগেও বীর জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। আনুমানিক ৪ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন ঘটে। আর্যরা ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকায় তাদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। এর তিন হাজার বছর পর অর্থাৎ আজ থেকে ৯০০ বছর আগে কর্ণাটক থেকে আসা সেনরা পাল শাসকদের পরাজিত করে ‘আর্য’ আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। পালেরা ছিলেন বৌদ্ধ। পক্ষান্তরে সেনেরা ছিলেন হিন্দু। কর্ণাটক থেকে আসা সেনদের অধীনে বাংলা শাসিত হয় ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তারপর তুর্কি, পাঠান মোগলদের দ্বারা বাংলা শাসিত হয়েছে। এমনকি যে সিরাজদ্দৌলাকে আমরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বলি, তিনিও কিন্তু স্বাধীন ছিলেন না। খাতাপত্রে হলেও ছিলেন মোগলদের অধীনে। ছিলেন না বাঙালিও। তবে এ কথা ঠিক, ভিনদেশ থেকে এলেও তাঁরা সবাই এ দেশকে নিজেদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এদিক থেকে ইংরেজরা ছিল ব্যতিক্রম। তারা এ দেশকে উপনিবেশ হিসেবেই ব্যবহার করেছে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বার তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। পাকিস্তানের সেই জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের দুটি বাদে সব আসনে জয়ী হয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়ী হয়। পাকিস্তান শাসনের ম্যান্ডেট পান শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সদস্যরা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ-দেশীয় অনুচর রাজাকার, আলশামস, আলবদর বাহিনীর হাতে। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মুখে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এ-দেশীয় দোসররা পরাজিত হয়। পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষ ছিল বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। তবে আত্মবিক্রীত কিছু ঘাতক দালাল পাকিস্তানি বাহিনীর তলপিবাহকের ভূমিকা পালন করে। তারা নিজেদের মা-বোনকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠাত দখলদারদের কাছে। স্মর্তব্য যে একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদারদের দোসর হিসেবে নগ্নভাবে ভূমিকা পালন করে যে ধর্মভিত্তিক দলটি, তারা ব্রিটিশের হাত থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছে। তাদের নেতা প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে নাপাকিস্তান বলে অভিহিত করতেন।
পাদটীকা : মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আর তাদের পদলেহী এ-দেশীয় ঘাতক দালালরা। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে অন্ধকারে রাখা হয়। তবে বেলুচ পাঠানদের অনেকেই ছিলেন বাঙালির পক্ষে। পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদে একজন পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পাঞ্জাবের আরেক তরুণ গণহত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খাটেন। এমনকি পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতেও বাধ্য হন। তাঁর নাম সৈয়দ আসিফ শাহকার। জন্ম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের হরপ্পায়। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। তখন তিনি পাঞ্জাব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৫ মার্চের কালরাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এর প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকের মধ্যে যারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন, তাদেরই একজন সৈয়দ আসিফ। বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন। তাঁকে দেশদ্রোহী হিসেবে জেলে ভরা হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন। সে সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁর বাবা তাঁকে কারাগারে দেখতে আসতেন এবং বাঙালির প্রতি দরদের জন্য কটুকথা বলতেন। তবু বাংলাদেশের বিপক্ষে যাননি সৈয়দ আসিফ শাহকার। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। তারপর নিজ দেশে বেশি দিন থাকতে পারেননি সৈয়দ আসিফ। ১৯৭৭ সালে তিনি সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। পরে সুইডেন হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগও পান।
পাকিস্তান ছাড়ার পর সৈয়দ আসিফ শাহকার মাত্র দুবার তাঁর দেশে আসেন। বাংলাদেশের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবের প্রতি ছিল তাঁর অসীম শ্রদ্ধা। শেখ সাহেব একাত্তরে পাকিস্তানের শাহিওয়াল জেলে বন্দি ছিলেন। সেই জেলখানায় যান সৈয়দ আসিফ।
২০১২ সালে সৈয়দ আসিফ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা গ্রহণের জন্য ঢাকায় আসেন। ৭৭ বছর বয়সি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ এই বিচারপতি মৃত্যুর পর বাংলাদেশে সমাধিস্থ হতে চেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা তাঁর কবর যেন হয় বাংলাদেশে। সৈয়দ আসিফ শাহকার বাংলাদেশে এসেছিলেন একবার। এ দেশে তাঁর কোন আত্মীয় নেই, তিনি বাংলাও বলতে পারেন না। তার পরও বাংলাদেশও যেন তাঁর স্বজন। এই বাংলাদেশের জন্য তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল তাঁর মাতৃভূমি, স্বজন, আত্মীয়, বন্ধু। প্রাণও হারাতে বসে ছিলেন। ছাড়তে হয়েছিল তাঁর পরিচয়ও।
-শ্রদ্ধা পাঞ্জাবের দুই মহান মানবতাবাদীকে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : sumonpalit@gmail.com
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
