২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা থেকে একটি সামরিক কার্গো বিমান (সি-১৩০জে) করে দেশ থেকে পালিয়ে আগরতলা হয়ে দিল্লির গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের পরামর্শে শেখ হাসিনা দ্রুত তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে পালিয়ে যান। যাত্রাপথ গোপন রাখতে তাদের বহনকারী হেলিকপ্টারের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়। ভারত সরকার ও দেশটির প্রধান বিরোধী দলসহ রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েই শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়।
আইসিটির এই রায়ের পাঁচ দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণ চায়।
অপরদিকে, গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানান।
এই চুক্তির আওতায় ভারত ২০১৫ সালে আসামের উলফা শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়াসহ আরো কিছু বাংলাদেশে পলাতক ভারতে প্রত্যর্পণ করে।
এই চুক্তিতে এমন কিছু ধারা আছে, যা অনুরোধ-প্রাপক দেশ নাকচ করতে পারে। যেমন: চুক্তির ২ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘যদি অনুরোধ-প্রাপক দেশ মনে করে ‘অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’, তাহলে অনুরোধ-প্রাপক দেশ প্রত্যর্পণ নাকচ করতে পারবে। এই ধারা অনুযায়ী ভারত হয়তো যুক্তি হাজির করতে পারে, ‘শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’। তাই মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত দুইজন সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার পাননি।
প্রত্যর্পণ চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোন কোন অপরাধকে ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ বলা যাবে না, যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, অনিচ্ছাকৃত হত্যা, গুম, সন্ত্রাস ও বোমা বিস্ফোরণের মতো অপরাধ। ভারত বলতে পারে, শেখ হাসিনার ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে নির্দেশদাতা হিসাবে অভিযোগ এনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখানে ভারত যুক্তি হাজির করতে পারে, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুইজন সরাসরি উল্লিখিত অপরাধে যুক্ত ছিল না।’
২০১৬ সালের সংশোধিত প্রত্যর্পণ চুক্তির ১০(৩) ধারায় বলা আছে, অভিযুক্তের হস্তান্তরের সময় অনুরোধকারী দেশকে প্রত্যেকটি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাঠানোর প্রয়োজন নেই; শুধু সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেই অনুরোধ বৈধ ধরা হবে।
ধারণা করা যেতে পারে, ভারত এই প্রত্যার্পণ চুক্তির ২ নম্বর, ৬ নম্বর ও ১০(৩) নম্বর ধারার মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করার যুক্তি হাজির করতে পারে এই বলে যে, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুইজন নিজেরা সরাসরি চুক্তি উল্লিখিত অপরাধগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল না’, ‘অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’ এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’।
বাংলাদেশের আইসিটির রায়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পরই ভারত সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলেছিল, “তারা রায়টি নজরে নিয়েছে।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, ‘ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত সব সময়ের মতোই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে নিবেদিত, যার মধ্যে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং দেশের স্থিতিশীলতা অন্তর্ভুক্ত। এটি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আমরা গঠনমূলকভাবে কাজ করব।’
ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছিল, ‘এই রায়ের পরও দিল্লির অবস্থান পরিবর্তন হয়নি এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তিনি ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের কাছে আশ্রয় পাচ্ছেন বা দেওয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত।’
এম এ আজিজ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
