অনলাইন ডেস্কঃ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছেন—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হয়েছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তিনি আজ অথবা আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন। যদিও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ বিষয়ে বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ গুঞ্জনের মধ্যেই আজ থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে এসেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে ফিরেছেন। বঙ্গভবনের একটি সূত্র জানিয়েছে, পদত্যাগের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সম্ভবত আজই পদত্যাগ করতে পারেন সাহাবুদ্দিন।
কীভাবে পদত্যাগ করবেন রাষ্ট্রপতি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত একটি পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করা, স্পিকারের সম্মতি নেওয়া বা সংসদের অনুমোদনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধানে স্পিকারকে সশরীরে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করারও কোনো শর্ত রাখা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম জানিয়েছেন, এখনো রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি। তবে পদত্যাগ করলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
পদ শূন্য হলে কী হবে?
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করবেন। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলেও সাংবিধানিক কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হবে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কোনো বিরতি ঘটবে না।
বাংলাদেশে এর আগেও এমন নজির রয়েছে। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নেন।
কত দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন?
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে। এটি সর্বোচ্চ সময়সীমা; তার আগেও নির্বাচন হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংবিধানের ১১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন পরিচালনা করবেন। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করা হবে। তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের তারিখ উল্লেখ থাকবে।
রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হন?
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। প্রার্থী নিজে সংসদ সদস্য না হলেও চলবে, তবে তার মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হবে।
মনোনয়ন যাচাইয়ের পর যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গোপন নয়; ব্যালটপত্রে ভোটদাতা সংসদ সদস্য নিজের নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেন।
বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলটির সমর্থিত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কত হবে?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পদত্যাগ না করলে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে।
তবে সংবিধানের ৫০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে নতুন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তার অবশিষ্ট মেয়াদ পূরণ করবেন না। বরং দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নতুন করে পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরু হবে।
কেন নতুন করে আলোচনায় পদত্যাগ?
বুধবার প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি ফেসবুক পোস্টের পর রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয়। পরে রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ সূত্রও জানান, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
রাষ্ট্রপতির এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, স্পিকার দেশে ফিরলেই তিনি বঙ্গভবনের দায়িত্ব ছাড়তে পারেন। বঙ্গভবনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও বলেছেন, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তবে সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার কারণে তা এখনো কার্যকর হয়নি।
স্বাস্থ্যগত কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগে ভুগছেন। ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়। ১২ মে মাসে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে এনজিওগ্রামের সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে স্টেন্ট বসানো হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নতুন সরকার এলে তিনি দায়িত্ব ছাড়তে চান। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে এক জটিল রাজনৈতিক সময় পার করেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যগত কারণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের চাপও তার সম্ভাব্য পদত্যাগের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কবে পদত্যাগ করবেন, সেটি এখন নির্ভর করছে আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
