প্রতিবছর ১৬ মে পালিত হয় ফারাক্কা দিবস, যার শিকড় মূলত ১৯৭৬ সালের মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আয়োজিত ঐতিহাসিক লংমার্চে। এবার রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় দিবসটি ছিল দৃশ্যমান এবং অংশগ্রহণে উৎসাহব্যঞ্জক। রাজশাহী এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে কেবল স্মরণ কিংবা ফটোসেশনে সীমাবদ্ধ থেকে নদীর প্রকৃত সংকট নিরসন সম্ভব নয়।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ উদ্বোধন নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মাওলানা ভাসানীর পরামর্শে প্রতিনিধি পাঠানো বাতিল করেছিলেন, যা ছিল এক শক্ত বার্তা। কারণ ১৯৭৪ সালের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে একমত হয়েছিল যে, পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ব্যারাজ চালু হবে না। ভারতের unilateral সিদ্ধান্ত ছিল এ চুক্তির বরখেলাপ।
১৯৭৬ সালে হাসপাতাল থেকে বের হয়েই মাওলানা ভাসানী ঘোষণা দেন ফারাক্কা লংমার্চের, যা পরে দেশের পানি-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রদর্শন নয়, ছিল একটি আত্মত্যাগমূলক প্রতিবাদ, যাতে নদীর ‘হক’ বা অধিকার রক্ষার বার্তা ছিল। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘেও বিষয়টি উত্থাপন হয়, যার পরিণতিতে হয় ১৯৭৭ সালের ৫ বছরের গঙ্গা পানি চুক্তি।
তবে বাস্তবতা হলো, ২০২৬ সালে শেষ হতে যাওয়া বর্তমান চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পানির হিস্যা ক্রমেই কমছে। শুধু ফারাক্কা নয়, গঙ্গার উজানে আরও অনেক বাঁধ ও ড্যাম রয়েছে যার তথ্য বাংলাদেশ জানে না। উপরন্তু, দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্মা, গড়াই, মধুমতী, কুমারসহ নদীগুলো থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে নগরবাসীর চাহিদা মেটাতে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সুন্দরবনের ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর হুমকি।
মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন, “নদীর সাগরের সঙ্গে মিলনের অধিকার আছে, না হলে প্রকৃতি ধ্বংস হবে।” আজ নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ মেনে আইন হলেও তার হক রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব লক্ষণীয়। পদ্মার পানি ঢাকায় তুলতে গিয়ে গোদাগাড়ীর প্রকল্প বা খুলনায় মধুমতীর ওপর নির্ভরতা এ সত্যই প্রকাশ করে।
ফারাক্কা দিবসের আলোচনা আজও যদি নদীর অধিকার, স্বচ্ছ পানি ব্যবস্থাপনা ও নিজের সক্ষমতা তৈরির দিকগুলো এড়িয়ে চলে, তাহলে শুধু স্মৃতিচারণ দিয়ে পদ্মাকে বাঁচানো যাবে না। আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
