অনলাইন ডেস্কঃ
মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছে। মানুষ চেয়েছে নিজের মত প্রকাশ করতে, নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে রক্ষা করতে এবং একটি নিরাপদ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে জীবনযাপন করতে। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা-গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাসে এই দুটি ধারণা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একদিকে গণতন্ত্র মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচারের কথা বলে; অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ একটি জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি রাষ্ট্র বা জাতিসত্তার ভিত্তি নির্মাণ করে।
গণতন্ত্র শুধু ভোটাধিকার নয়; এটি মানুষের সার্বিক মুক্তির ধারণা। বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন-সবকিছুই গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে জাতীয়তাবাদ শুধু পতাকা বা ভূখণ্ডের প্রতি আবেগ নয়; এটি একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐক্য ও সম্মিলিত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক এই দুটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত Nationalism গ্রন্থে জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জাতীয়তাবাদ যদি মানবিকতা হারিয়ে ফেলে তবে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আবার মানবিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির উপর দাঁড়ানো জাতীয়তাবাদ একটি জাতিকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে।
গণতন্ত্রের ধারণা ও বিকাশ
‘Democracy’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Demos’ এবং ‘Kratos’ থেকে। ‘Demos’ অর্থ জনগণ এবং ‘Kratos’ অর্থ ক্ষমতা। অর্থাৎ জনগণের ক্ষমতাই গণতন্ত্র। প্রাচীন এথেন্স নগররাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। সেখানে নাগরিকরা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতেন। যদিও সেই গণতন্ত্র সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ নারী, দাস ও বিদেশিরা এর বাইরে ছিল। পরে আধুনিক যুগে গণতন্ত্রের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়। ইউরোপে রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা বিকশিত হয়। বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লব আধুনিক গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’-এই তিনটি আদর্শ গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে।
গণতন্ত্রের প্রধান উপাদানগুলো হলো- জনগণের সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নির্বাচন ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র জনগণের সেবক, শাসক নয়। জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো সরকার বৈধ হতে পারে না। এজন্য গণতন্ত্রকে অনেকেই ‘জনগণের সরকার’ বলে অভিহিত করেন।
গণতন্ত্র মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। একজন মানুষ কী বলবে, কী লিখবে, কোন ধর্ম পালন করবে কিংবা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করবে এসব বিষয়ে রাষ্ট্র অযথা হস্তক্ষেপ করবে না। গণতন্ত্র ব্যক্তি মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেয়।
পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তিও গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেবল রাজনৈতিক অধিকার থাকলেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না; অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই আধুনিক গণতন্ত্র সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। জন লক মনে করতেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্যই রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্র যদি মানুষের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তবে জনগণের সেই রাষ্ট্র পরিবর্তনের অধিকার আছে।
অন্যদিকে জ্যাঁ জ্যাক রুশো তার ‘Social Contract’ তত্ত্বে বলেন, জনগণের সাধারণ ইচ্ছাই রাষ্ট্রের ভিত্তি। জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো শাসন বৈধ হতে পারে না। জন স্টুয়ার্ট মিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের প্রাণ বলে মনে করতেন। তার মতে, ভিন্নমত দমন করলে সমাজের চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এবার জাতীয়তাবাদের ধারণা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
জাতীয়তাবাদ এমন একটি মানসিক ও রাজনৈতিক চেতনা যা মানুষকে একটি জাতিগত, সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে। জাতীয়তাবাদ মানুষকে বলে ‘আমরা একটি জাতি, আমাদের একটি সম্মিলিত ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ রয়েছে।’ জাতীয়তাবাদের মূল উপাদান হলো- অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূখণ্ড, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্মিলিত চেতনা।
জাতীয়তাবাদ জাতিকে সংগঠিত করে। একটি জাতির মধ্যে আত্মত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধ সৃষ্টি করে। যখন জাতীয়তাবাদ দুর্বল হয়, তখন রাষ্ট্রের সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার অতিরিক্ত উগ্র জাতীয়তাবাদ অনেক সময় অন্য জাতির প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আধুনিক জাতীয়তাবাদের উত্থান মূলত ইউরোপে। ফরাসি বিপ্লব এর পরে ইউরোপে জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়। জনগণ বুঝতে শুরু করে যে, রাষ্ট্র কোনো রাজা বা সম্রাটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের। জিউসেপ্পে মাজিনি ইতালির জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র থাকা উচিত। অটো ভন বিসমার্ক জার্মান জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে জার্মান জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। তার Nationalism গ্রন্থে তিনি পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, জাতীয়তাবাদ যদি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা, সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মানবতার জন্য বিপজ্জনক। তিনি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধনীতির মধ্যে এই বিপদ দেখেছিলেন। তার মতে, ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদ হওয়া উচিত মানবিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ভারতবর্ষ বহু ভাষা, বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দেশ। এখানে জোরপূর্বক একরূপতা চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃত জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের পরিচয় শুধু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নয়; মানুষ প্রথমত মানুষ। তাই তিনি মানবতাবাদকে জাতীয়তাবাদের উপরে স্থান দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- জাতীয়তাবাদ মানবতাবিরোধী হতে পারে না; সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে; মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে সম্মান করতে হবে। রাষ্ট্র যেন মানুষের উপর যন্ত্রের মতো চাপিয়ে না বসে। তাই প্রাচ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা পাশ্চাত্যের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। এখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভূমিকা বেশি। মহাত্মা গান্ধী জাতীয়তাবাদকে অহিংস সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার মতে, সত্য ও নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদই টেকসই। গান্ধী বিশ্বাস করতেন, গ্রামের উন্নয়ন, স্বনির্ভর অর্থনীতি ও সামাজিক সম্প্রীতি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হওয়া উচিত।
কাজী নজরুল ইসলাম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবিক জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন। তার সাহিত্য মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার আহ্বান জানায়। আল্লামা ইকবাল মুসলিম জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা করলেও আত্মমর্যাদা ও আত্মজাগরণের উপর জোর দিয়েছেন।
পাশ্চাত্যের বহু চিন্তাবিদ গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে কাজ করেছেন। থমাস হবস মনে করতেন, মানুষের নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার। তার মতে, রাষ্ট্র না থাকলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। মন্টেস্কু ক্ষমতার বিভাজনের ধারণা দেন। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অ্যালেক্সিস দ্য টকভিল গণতন্ত্রের সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অত্যাচারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তার ‘Imagined Communities’ তত্ত্বে বলেন, জাতি আসলে একটি কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়। মানুষ একে অপরকে না চিনলেও নিজেদের একই জাতির সদস্য বলে কল্পনা করে। আর্নেস্ট গেলনার মনে করতেন, আধুনিক শিল্পসমাজ জাতীয়তাবাদের জন্য দিয়েছে। শিল্পায়নের জন্য একটি অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি দরকার হয়, যা জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে।
গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক
গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এই দুটি ধারণা কখনো একে অপরকে শক্তিশালী করে, আবার কখনো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র জনগণের মতামত, অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ জনগণকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই দুটি ধারণা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা মনে করেন, একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের জন্য গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, আবার সংঘর্ষেও জড়াতে পারে। গণতন্ত্র জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। জাতীয়তাবাদ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে। একটি রাষ্ট্রে যদি জাতীয় ঐক্য না থাকে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার গণতন্ত্র না থাকলে জাতীয়তাবাদ স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হতে পারে। সুস্থ জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। কারণ এটি নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদ ভিন্নমত দমন করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের কথা বলা যায়। আডলফ হিটলার জাতীয়তাবাদকে উগ্র বর্ণবাদে রূপ দিয়েছিলেন, যা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। অন্যদিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। ফরাসি দার্শনিক Jean-Jacques Rousseau তার ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তত্ত্বে বলেছিলেন, রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো শাসনব্যবস্থা বৈধ হতে পারে না। গণতন্ত্র সেই সম্মতির কাঠামো তৈরি করে। এখানে জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু জনগণ যদি নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে অনুভব না করে, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও এক ধরনের জাতীয় সংহতি প্রয়োজন।
এই জায়গায় জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয়তাবাদ মানুষের মধ্যে একটি যৌথ পরিচয় সৃষ্টি করে। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূখণ্ড কিংবা স্বাধীনতার স্মৃতি এসব উপাদান মানুষকে একই জাতির সদস্য হিসেবে একত্রিত করে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী Benedict Anderson জাতিকে ‘Imagined Community’ বা কল্পিত সম্প্রদায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার মতে, একটি জাতির সব মানুষ একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তারা নিজেদের একই জাতির অংশ বলে কল্পনা করে। এই কল্পিত ঐক্যই জাতীয়তাবাদের শক্তি। গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন জনগণ নিজেদের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে দেখে।
জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী Jürgen Habermas ‘Constitutional Patriotism’ তত্ত্বের কথা বলেন। তার মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদ কেবল ভাষা বা বর্ণের উপর নির্ভর করলে তা বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংবিধান এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ একটি জাতির ঐক্যের ভিত্তি হবে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মিলিত বিশ্বাস। এই ধারণা গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক তত্ত্বে ‘Civic Nationalism’ ‘Ethnic Nationalism’ নামে দুটি ভিন্ন ধরনের জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়। সিভিক বা নাগরিক জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে নাগরিকত্ব, আইন ও রাজনৈতিক অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদ অনেকাংশে এই ধারার উদাহরণ। কিন্তু এথনিক বা জাতিগত জাতীয়তাবাদ বর্ণ, ধর্ম বা রক্তের সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই ধরনের জাতীয়তাবাদ অনেক সময় ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে বাদ দিতে চায়। ফলে এটি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এই তত্ত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হলো Adolf Hitler-এর নাৎসিবাদ। হিটলার জার্মান জাতীয়তাবাদকে চরম বর্ণবাদে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি আর্য জাতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রচার করেন এবং ইহুদিদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই উগ্র জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়। জার্মানিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ হয়ে যায়। বিরোধী দল নিষিদ্ধ হয়। সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও গণহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ Hannah Arendt এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে ‘Totalitarianism’ বা সর্বগ্রাসী শাসন বলেছেন। তার মতে, যখন রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে জনগণের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়।
অন্যদিকে সুস্থ জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। Mahatma Gandhi এবং Jawaharlal Nehru জাতীয়তাবাদকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু সেই জাতীয়তাবাদ ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। সেখানে ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজনের পরিবর্তে স্বাধীনতা, অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ছিল প্রধান। ফলে জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকে শক্তিশালী করেছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Ernest Gellner মনে করেন, আধুনিক জাতীয়তাবাদ শিল্পায়ন ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য একটি সাধারণ ভাষা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং অভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রয়োজন হয়। জাতীয়তাবাদ সেই কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু যদি এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের অধিকার উপেক্ষা করা হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদকে অবশ্যই বহুত্ববাদকে সম্মান করতে হবে।
একইভাবে উদারতান্ত্রিক চিন্তাবিদ John Stuart Mill বলেছিলেন, গণতন্ত্র তখনই সফল হয় যখন জনগণের মধ্যে একটি সাধারণ জাতীয় অনুভূতি থাকে। কারণ ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যদি গভীর বিভাজন থাকে, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। তবে তিনি এটাও সতর্ক করেছিলেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করতে পারে। তাই গণতন্ত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্বায়নের কারণে অনেক রাষ্ট্রে জাতীয়নি পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক জায়গায় ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হচ্ছে। তারা অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে ‘রক্ষা’ করার কথা বলছে। কিছু ক্ষেত্রে এই জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করছে। আবার অন্যদিকে ইউক্রেনের মতো দেশে জাতীয়তাবাদ জনগণকে স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ করছে। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ সবসময় নেতিবাচক নয়; এটি কোন আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয়তাবাদ ছিল জনগণের ঐক্যের প্রধান শক্তি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনা জনগণকে একটি অভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে একত্রিত করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্নটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ কেবল জাতীয়তাবাদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়; জনগণের অংশগ্রহণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সঠিক ভারসাম্যের মাধ্যমে তারা পরস্পরের শক্তি হতে পারে। সুস্থ জাতীয়তাবাদ নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও ঐক্য সৃষ্টি করে। আর গণতন্ত্র সেই জাতীয় ঐক্যকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ যদি উগ্রতা, বর্ণবাদ বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে যায়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর জাতীয়তাবাদী দর্শন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্রচিন্তা উপস্থাপন করেন, যেখানে জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সেই ঐক্যের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে একটি সাধারণ জাতীয় চেতনা প্রয়োজন। Jean-Jacques Rousseau যেমন জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন, তেমনি জিয়াউর রহমানও বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের জনগণকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে আনতে হবে। তার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ মূলত সেই ঐক্যের ধারণা বহন করে। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের মানুষ শুধু ভাষাগত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র, ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সার্বভৌমত্ব মিলেই একটি পৃথক জাতীয় সত্তা গড়ে উঠেছে।
এই ধারণা অনেকাংশে Benedict Anderson-এর ‘Imagined Community’ তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কারণ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এমন একটি কল্পিত জাতীয় ঐক্যের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে ধর্ম, অঞ্চল বা শ্রেণিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে ভাববে। তার রাজনৈতিক বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নটি বারবার উঠে এসেছে। একইসঙ্গে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গণতন্ত্রের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। এটি Jürgen Habermas-এর ‘Constitutional Patriotism’ ধারণার সঙ্গে আংশিকভাবে সম্পর্কিত। কারণ জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সাংবিধানিক কাঠামোকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মতে, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী রাজনীতির উপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।
তবে তার জাতীয়তাবাদ ছিল মূলত ‘Civic Nationalism’ বা নাগরিক জাতীয়তাবাদের কাছাকাছি। কারণ তিনি জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে কেবল বর্ণ বা ধর্মকে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও নাগরিক ঐক্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বাধীন পরিচয় প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। তিনি জনগণের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যা সুস্থ জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এখানে তার জাতীয়তাবাদকে উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে আলাদা করাও জরুরি। ইউরোপের ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ যেমন ভিন্নমত দমন ও বর্ণবাদকে উসকে দিয়েছিল, জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদ তার বিপরীতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তিনি জাতীয়তাবাদকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন, যুবশক্তির বিকাশ এবং জনগণের আত্মাবিশ্বাস বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ফলে তার জাতীয়তাবাদ কেবল আবেগভিত্তিক ছিল না; বরং রাষ্ট্র গঠন ও উন্নয়নের একটি বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক দর্শনে রূপ নিয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শন গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শক্তিশালী জাতীয় চেতনা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। আবার জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয়তাবাদও অর্থবহ হয় না। তাই তার রাষ্ট্রচিন্তায় জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক শক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে তোলে। পরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ মূলত ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গণতন্ত্র দুর্বল হলে মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার জাতীয় ঐক্য দুর্বল হলে রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন- মানবিক গণতন্ত্র, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, আইনের শাসন, জাতীয় ঐক্য ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা।
বিশ্বায়ন ও নতুন জাতীয়তাবাদ
বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়নের কারণে জাতীয়তাবাদের ধারণা নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। একদিকে মানুষ বৈশ্বিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাছাকাছি আসছে; অন্যদিকে অনেক দেশে নতুন করে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অভিবাসন সংকট, সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি কারণে অনেক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। ফলে গণতন্ত্রও অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের মানবিক জাতীয়তাবাদের ধারণা নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি যে বিশ্বমানবতার কথা বলেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।
গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দুটি মৌলিক ভিত্তি। গণতন্ত্র মানুষকে স্বাধীনতা ও অধিকার দেয়; জাতীয়তাবাদ মানুষকে ঐক্য ও আত্মত্মপরিচয় দেয়। তবে এই দুটি ধারণার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয়তাবাদ যদি মানবিকতা হারায়, তবে তা উগ্রতায় পরিণত হয়। আবার গণতন্ত্র যদি জাতীয় ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন মানবিক গণতন্ত্র এবং সহনশীল জাতীয়তাবাদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো রাষ্ট্র নয়। মানুষের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই প্রকৃত জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠতে পারে। একইভাবে প্রকৃত গণতন্ত্রও কেবল ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের সামগ্রিক মুক্তির নাম।
অতএব, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক সহনশীলতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
