আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর গত বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্র্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ। হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছিলেন তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। তাই অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল একটি স্বচ্ছ ইমেজ প্রতিষ্ঠা।
এপিএস পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। অন্যদিকে গত বছরের ২ অক্টোবর তুহিন ফারাবীকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর বাড়ি নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলায়। তাঁর নিয়োগের অফিস আদেশে বলা হয়েছিল, তুহিন ফারাবীর এ নিয়োগ হবে অস্থায়ী। উপদেষ্টা যতদিন এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন, অথবা যতদিন তাঁকে এ পদে রাখার ইচ্ছা পোষণ করবেন, ততদিন তিনি এ পদে বহাল থাকবেন। তাঁকে নিয়েও মন্ত্রণালয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তুহিন ফারাবী কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মেডিকেল দলের সদস্য।
শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। গত ২১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মুহাম্মদ তুহিন ফারাবীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দুই উপদেষ্টার এপিএস ও পিও-এর বিরুদ্ধে বদলি-পদোন্নতির মাধ্যমে ঘুস বাণিজ্য, কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্য, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ওঠে। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুদক। (বিএফআইইউ) মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাববিবরণী সংগ্রহ করা হয়। এতে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের জন্য টিম গঠন করা হয় ৪ মে। আরও জানা যায়, পৃথক দুটি অনুসন্ধান টিম স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পিও তুহিন ফারাবীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে। এ ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব এ বি এম গাজী সালাউদ্দিন আহমেদ তানভীর ও ডা. মাহমুদুল হাসানকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। তাদের ২০, ২১ ও ২২ মে হাজির হওয়ার জন্য নোটিস দেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। প্রথম দফায় তারা নির্ধারিত দিনে হাজির হননি। পরবর্তী ধার্য দিনে তারা একে একে সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে অনুসন্ধান টিমের কাছে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এর বাইরে এ সংক্রান্ত অনুসন্ধান কাজে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদের’ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকে তলবের ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দেয়। সেই কর্মকর্তা আতিক মোর্শেদ দুদকে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন, তবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করেনি দুদক। নগদ-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছিল দুদক। এ ছাড়া ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ মি. মোর্শেদ ও তার স্ত্রীকে গত ২ জুন দুদকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারপর এই তদন্তেরও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
প্রশ্ন উঠেছে, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার ঘটনাগুলোয় উপদেষ্টা কিংবা যার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে এসব ব্যক্তিরা কাজ করেছেন, তার দায় এড়ানোর সুযোগ আছে? এ ছাড়াও একজন উপদেষ্টার স্বামী আওয়ামী লীগের একজন পলাতক মন্ত্রীর সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। তার এই অভিযোগের জবাব অবশ্য ওই উপদেষ্টার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। এভাবেই গত দেড় বছরে উপদেষ্টা পরিষদের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্র্বর্তী সরকার দুর্নীতি কমালেও দুর্নীতির বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
