ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সদ্যোবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব সুবিধা আদায় করে নিয়েছে, সে সম্পর্কে দুজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ মতামত দিয়েছেন।
মনজিল মোরসেদ
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, জনগণের প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে, এটা হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক চেতনা। ফলে যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের সঙ্গে যাতে জনগণ, দেশের স্বার্থের সংঘাত না ঘটে সে জন্য শপথ নিতে হয়।
কেউ যখন ব্যবসা করছেন, মুনাফা করছেন, তাঁর জন্য তাঁকে বা কাউকে কিন্তু শপথ নিতে হচ্ছে না যে ব্যবসা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কম বা বেশি মুনাফা নিবেন।
আইনজ্ঞ মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করে উনি দেশের জনগণ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি জনগণের মালিকানা কমিয়ে নিজের মালিকানা বাড়িয়েছেন। আমাকে-আপনাকে, সবাইকে তিনি প্রতারিত করলেন। এটি মারাত্মক ধরনের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। জনগণ উনাকে বসিয়েছিল (প্রধান উপদেষ্টা পদে) জনগণের স্বার্থ দেখার জন্য। কিন্তু উনি সেখানে বসে নিজের স্বার্থ দেখলেন, শপথ ভঙ্গ করলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করলেন। ফলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে এত কিছু বলা যায়, যা অন্য কোনো রাজনীতিক সম্পর্কে বলা যায় না।’
প্রধান উপদেষ্টা পদে থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বার্থের সংঘাতপূর্ণ যেসব কাজ করেছেন, প্রতিটি কাজ নির্বাচিত সরকারের বাতিল করা উচিত বলে মনে করেন মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার হয়তো বাতিল না-ও করতে পারে। কারণ উনার সঙ্গে মৌখিক বোঝাপড়ার পরই কিন্তু নির্বাচনটা হয়েছে। ফলে আমরা জানি না, উনার কৃতকর্মগুলো আদৌ বাতিল করা হবে কি না। যদি সরকার না করে, তবে আমি মনে করি দেশের নাগরিকদের এই দাবিটা তোলা উচিত। কেউ চাইলে আদালতের মাধ্যমেও তাঁর কর্মকাণ্ড চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। আমার ধারণা, আজ হোক কাল হোক, প্রতিটি বিষয় আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হবে। সরকার করলে ভালো হতো, দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়ে যেত। তাই সরকারের কাছে আমি আহবান জানাব, প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসে উনি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের যেসব কাজ করেছেন, গর্হিত কাজ করেছেন, তার সবই বেআইনি, সব বাতিল করা হোক। সুযোগ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিদ।’
ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময় কেন এসব বিষয় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি, এই প্রশ্নের ব্যাখ্যায় মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘তখন দেশ একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। উনি একটা বাহিনী তৈরি করেছিলেন মব সষ্টি করার জন্য। ফলে আদালতও সেই সময় দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি। দৃঢ়তা দেখালে হয়তো আদালতের ওপরও আক্রমণ হতো এবং হয়েছেও। আমার ধারণা, ভবিষ্যতে কেউ না কেউ এই বিষয়গুলো আদালতের সামনে আনবেন।’
শাহদীন মালিক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধানের ১৪৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সাংবিধানিক পদে থাকাকালীন অবস্থায় কোনো লাভজনক কাজে নিয়োজিত হতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দিনে কোর্টে কাজ করে রাতে চেম্বার করতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতিও তাঁর কাজ শেষে সিনেমা হলের ম্যানেজারের কাজ করতে পারবেন না। ড. ইউনূস তাঁর নিজের বা নিজের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়ে সংবিধানের ১৪৭ ধারার বরখেলাপ করেছেন।’
এই আইনজ্ঞ আরো বলেন, ‘ড. ইউনূস এখন সরাসরি গ্রামীণের সঙ্গে যুক্ত না। কিন্তু আমরা ছোটবেলা থেকেই গ্রামীণ বলতেই বুঝি ড. ইউনূস। গ্রামীণের টেলিকম, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংকসহ অনেক ব্যবসা আছে। গ্রামীণের অনেক প্রতিষ্ঠানে ইউনূস অনেক সময় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সরাসরি না হলেও জনগণের ধারণা, উনি এখান থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। এটা তিনি অসাংবিধানিক কাজ করেছেন, যেটা তাঁর মতো ব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল না।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
