Thursday , 16 July 2026
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
ক্ষমতার পর মন্থরতা : বিএনপির করণীয়
--অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী

ক্ষমতার পর মন্থরতা : বিএনপির করণীয়

অনলাইন ডেস্ক:

রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য চূড়ান্ত সাফল্য নয়; বরং সেটিই একটি নতুন পরীক্ষার সূচনা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, জন-আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর যখন একটি দল সরকার গঠন করে, তখন জনগণের প্রত্যাশা বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, আন্দোলন, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়।

কারণ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন সরকার গঠনের পর দলের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

মন্ত্রিসভা, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ—এসব দায়িত্ব তাদের সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নেয়। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ডে সময় দেওয়া কমে যায়। এছাড়া অনেক সময় সরকার ও দলের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন থাকে না। ফলে দলীয় সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক প্রভাব পড়ে, দলীয় কর্মীরা সরাসরি সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, এটি দীর্ঘমেয়াদে দলীয় স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।এদিকে ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক নেতার সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব তৈরি হয়।

যে কর্মীরা আন্দোলনের সময় পাশে ছিলেন, তারা অনেক সময় অবহেলিত বোধ করেন। ক্ষমতায় গেলে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে পদ-পদবী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এর ফলে— অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং, নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এসব বিষয় দলীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার ফলে একটি দল আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্ষমতায় এসে সেই ধারা থেকে বের হয়ে নীতিনির্ভর ও প্রশাসনিক রাজনীতিতে রূপান্তর করতে সময় লাগে।তাছাড়া দলের আদর্শ ও দর্শন যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে তা বলার মত পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তবে দলীয় রাজনীতিতে মন্থরগতির প্রভাব বিপজ্জনক। দলীয় কার্যক্রম কমে গেলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলে জনসমর্থনও কমে যায়। তৃণমূলের কর্মীরা যদি নিজেদের মূল্যায়িত মনে না করেন, তাহলে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে যায়। দল দুর্বল হলে বিরোধী শক্তি সেই সুযোগ নেয়।

বিএনপির জন্য করণীয়

দল ও সরকারের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন : সরকার পরিচালনা এবং দল পরিচালনা—এই দুটি ক্ষেত্রকে আলাদা রাখতে হবে। দলকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কার্যকর রাখতে হবে।

তৃণমূলের সঙ্গে পুনঃসংযোগ :  নিয়মিত সাংগঠনিক সফর, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ, অভিযোগ ও পরামর্শ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করলে আস্থার সংকট দূর হবে।

সাংগঠনিক পুনর্গঠন : জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি, যোগ্য ও কর্মীবান্ধব নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া গেলে দল শক্তিশালী হবে।

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা : দলের ভেতরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে দল লাভবান হবে।

প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক শিক্ষা : কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে তারা দলের আদর্শ ও নীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পায়।

তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ : যুবসমাজকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের জন্য নেতৃত্বের সুযোগ তৈরা করা গেলে যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর সংগঠন : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা কর্মীদের সাথে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে
তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে দল উপকৃত হবে সন্দেহ নেই।

দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধ : ক্ষমতায় গেলে এই দুটি বিষয় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কঠোরভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য হলো স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন সৃষ্টি।  একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল—জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করে, নেতৃত্বে স্বচ্ছতা বজায় রেখে, পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে। বিএনপিকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। নতুন প্রজন্মের ভোটার, প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। বিএনপির জন্য এটি একটি সুযোগ—নিজেদের পুনর্গঠন করে একটি আধুনিক, জনমুখী ও কার্যকর রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার।

মন্থরতা থেকে গতিশীলতার পথে রাজনীতিতে স্থবিরতা মানেই পিছিয়ে পড়া। সরকার গঠনের পর যদি দলীয় রাজনীতি মন্থর হয়ে পড়ে, তাহলে সেই অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিএনপির উচিত—এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার ক্ষমতায় নয়, বরং তার সংগঠনে, আদর্শে এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায়। অতএব, সময়ের দাবি—মন্থরতা ভেঙে গতিশীল হওয়া, বিচ্ছিন্নতা (যদি হয়ে থাকে) ভেঙে সংযোগ তৈরি করা, এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে রূপান্তর করা জনকল্যাণের রাজনীতিতে। তবেই একটি দল কেবল সরকার নয়, ইতিহাসও নির্মাণ করতে পারে।

লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply