২৪-এ জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে খুব অল্প সময়েই দেশে অপশাসনের পতন ঘটে। পালিয়ে যান স্বৈরাচার সরকার। আর এই আন্দোলনে যারা ফ্রন্টলাইনে ছিলেন তাদের জুলাইযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। তবে তাদের এই তুমুল আন্দোলনের ফাঁকেই এক শ্রেণির সুবিধাবাদী মানুষ জুলাইযোদ্ধার মুখোশ পরে চালিয়ে গেছে নজিরবিহীন অপকর্ম।
তেমনি একজনের খোঁজ মিলেছে রাজশাহীতে। জুলাইযোদ্ধা নামধারী এই ব্যক্তির নাম গোলাম রাব্বানী। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।
ওই এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই পরিমাণ জমির মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। গোলাম রাব্বানী এই জমি দেবাশীষ রায় নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই জমি সরকারের ‘খ’ তফসিলভুক্ত, অর্থাৎ অর্পিত বা শত্রু সম্পত্তি।
এই অভিযোগের সত্যতা মেলে তানোরের সাদিপুরে ওই জমিতে বসবাসকারী মানুষের কাছ থেকে। এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে ১৩ শতক জমিতে বসবাস করছি। প্রতিবছর সরকারের কাছে চেক কেটে আমরা এই জমিতে ভূমিহীন হিসেবে বসবাস করি। আমাদের তিন ভাইয়ের তিনটি বাড়ি আছে এখানে। কিছুদিন আগে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ও তার লোকজন এসে বলেন—এই জমি তারা কিনে নিয়েছেন। কিভাবে কিনে নিয়েছেন জানতে চাইলে তারা কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি। কিন্তু আমাদের বাড়ি ভেঙে উচ্ছেদ করা হবে বলে হুমকি দিয়ে গেছেন। আমরা এত দিন ধরে এনিমি সম্পত্তিতে বসবাস করছি। কেউ কখনো বলল না এই জমি আমাদের। এখন গোলাম রাব্বানী বলেন তিনি নাকি কিনে নিয়েছেন।’
ভুট্টু নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য খুব চেষ্টা করছে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী। আমরা এখন কোথায় যাব? এই সম্পত্তি তো বিক্রি হওয়ার কথা নয়। ওরা ভুয়া কাগজ তৈরি করে ভূমি অফিস থেকে নামজারি করেছে হয়ত। আপনারা খোঁজ নেন। আমাদের পাশে দাঁড়ান।’
পৌনে তিন কোটিরও বেশি টাকা দিয়ে ২৪ বিঘা জমি কেনার কথা স্বীকার করেন গোলাম রাব্বানী। এত টাকা কোথায় কিভাবে পেলেন, জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমি ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। জয়পুরহাটে আমার বাবার বাড়ি পাঁচ বিঘা জমির ওপর। এ ছাড়া আমি ১৭টি প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্সি করি। টেলিভিশন চ্যানেলের চাকরি থেকে বছরে আমার তিন লাখ টাকার ওপরে আয় হয়। ওই সব আয় দিয়ে আমি জমিগুলো কিনেছি।’ ওই জমি অর্পিত সম্পত্তি নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্য একটি ঘটনায় রাজশাহীর তানোর ভূমি অফিসের একটি সূত্র জানায়, এ উপজেলার ৯টি মৌজায় ৩০ বিঘা অর্পিত সম্পত্তি নামজারি ও অর্পিত সম্পত্তি কেটে ব্যক্তি সম্পত্তি করার জন্য রাজশাহী নগরীর সাগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা দেবাশীষ রায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে দেবাশীষ রায়ের স্বাক্ষর দেওয়া থাকলেও সেখানে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয় সাংবাদিক গোলাম রাব্বানীর। তবে ওই নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
জানা গেছে, এই দেবাশীষ রায় আর গোলাম রাব্বানীর কাছে আগের বছরেই ২৪ বিঘা জমির বিক্রেতা দেবাশীষ রায় একই ব্যক্তি।
দেবাশীষের ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘আরএস খতিয়ান মূলে ওই জমির রেকর্ড বিভূতি ভূষণ রায় চৌধুরী, অহি ভূষণ রায় চৌধুরী ও সুখদা সুন্দরী দেবী নামে প্রকাশিত। ওয়ারিশ সূত্রে আমি আবেদনকারী শ্রী দেবাশীষ রায় সংযুক্ত তফসিল বর্ণিত সম্পত্তির অংশীদার। বিভূতি ভূষণ রায় ও সুখদা সুন্দরী দেবী নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে ওয়ারিশ সূত্রে একমাত্র অহি ভূষণ রায় ষোলো আনা সম্পত্তির মালিক হন। এরপর অহি ভূষণ রায়ের মৃত্যুর পর তার একমাত্র কন্যা ঝর্ণা রায় ওই সম্পত্তির মালিক হন। এরপর ঝর্ণা রায়ের মৃত্যুর পর তার একমাত্র সন্তান হিসেবে আমি দেবাশীষ রায় ওই জমির মালিক হই। কিন্তু আমি সংখ্যালঘু হওয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল আমাকে ভূমি উন্নয়ন কর, অর্পিত সম্পত্তি কর্তনপূর্বক নতুন হোল্ডিং চালু ও নামজারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে দেয়নি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভাগীয় কমিশনারের টেবিল থেকে দ্রুতগতিতে দেবাশীষের আবেদনের ওই ফাইল রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তর হয়ে চলে যায় তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশতুরা আমিনার কাছে। এরপর তিনি দেবাশীষ রায়কে তার নামে নামজারি করার জন্য গত বছরের ২০ এপ্রিল নোটিশ জারি করেন। তবে শুনানি শেষে বিষয়টির সত্যতা না পেয়ে মাশতুরা আমিনা দেবাশীষ রায়ের পক্ষে নামজারি এবং খাজনা দেওয়ার রায় দেননি।
অনুসন্ধান বলছে, এরপর গোলাম রাব্বানী রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার মধ্যেমে মাশতুরা আমিনাকে বদলি করান। তার স্থলে যোগদান করেন শীব শংকর বশাক। তবে এখন পর্যন্ত ওই জমিটি দেবাশীষ রায়কে দেওয়া হয়নি।
এই জমি সম্পর্কে জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমার মোবাইল ফোন নম্বর কেউ ব্যবহার করতে পারে। ওই জমি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’ তবে রাব্বানী এও বলেন, ‘জমিটি পেলে আমার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আমাকে কিছু অংশ দিতে হবে দেবাশীষ রায়কে।’
এই অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শীব শংকর বশাককে গতকাল বারবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খান বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এই ধরনের আবেদনের বিষয় আমার জানা নেই। এতগুলো সম্পত্তি একজন ব্যক্তি কিভাবে পর্যায়ক্রমে এসে এককভাবে মালিক হলো, সেটি দেখার বিষয় আছে।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
