সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ বলেছেন, ড. ইউনূস গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, তারপর থেকেই সবাই বিশ্লেষণ করছেন—কার লাভ হলো, কার ক্ষতি হলো, কে জিতল, কে পরাজিত হলো। এ ধরনের নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। আমি মনে করি, ইউনূসের ভাষণে বড় ধাক্কা খেল জামায়াতে ইসলামী।
শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) নিজের ইউটিউব চ্যানেল ‘ভয়েস বাংলা’-তে মোস্তফা ফিরোজ এসব কথা বলেন।
মোস্তফা ফিরোজ বলেন, ইউনূসের ভাষণে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেল জামায়াতে ইসলামী। কারণ, জামায়াত একদিকে ঐকমত্য কমিশনে ড. ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে, আবার অন্যদিকে আন্দোলনও করছে। একই সঙ্গে আলোচনায় থাকা এবং আন্দোলন করা—এই দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। এতে আন্দোলনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকে না।
জামায়াত প্রসঙ্গে মোস্তফা ফিরোজ বলেন, আপনি কার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন? যদি আপনি ঐকমত্য কমিশনের কোনো সিদ্ধান্তই না মানেন, তাহলে বিএনপি, এবি পার্টি ও এনসিপিও মানে না। সবাই যদি না মেনে আন্দোলন শুরু করে, তাহলে সমাধান কোথায়? আপনাকে কিছু না কিছু মানতেই হবে। কিছু ছাড় দিতে হবে—এটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কয়েকটি বিষয় না মানার কারণে আপনি আন্দোলন শুরু করলেন, এটি যৌক্তিক নয়।
ড. ইউনূসকে মানতেই হবে—জামায়াতের এই অবস্থান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যায় না।
নভেম্বরে গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত চাচ্ছে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট। এজন্য তারা নানা ধরনের হুমকিও দিয়েছে। তারা বলছে—নভেম্বরে গণভোট না হলে জাতীয় নির্বাচন হবে না। এ অবস্থান নিয়েই তারা আন্দোলন করছে।
অর্থাৎ আগে গণভোট, পরে নির্বাচন। আর আদেশ-সংস্কারের ক্ষেত্রে সংসদের ওপর তাদের বিশ্বাস নেই; নির্বাচনের পর যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, বিএনপি নাকি সেটা মানবে না। আর সেকারণেই এখনই গণভোটের বিষয়টি আইনে রূপ দিতে হবে—এমন দাবিতেই তাদের বড় ধরনের শোডাউন হওয়ার কথা ছিল। ‘যমুনা ঘেরাও’ কর্মসূচি এবং সেখানে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা ছিল। কিন্তু ইউনূসের ভাষণের পর রাজনৈতিকভাবে জামায়াত বড় ধরনের ধাক্কা খেল। তারা এই ধাক্কা চেপে রাখছে, মুখ ফুটে বলতে পারছে না যে, তাদের জন্য এটি বড় আঘাত। মুখ বুজে সব সহ্য করতে হচ্ছে।
মোস্তফা ফিরোজ বলেন, গণভোটে একাধিক প্রশ্ন, একটা-দুটো নয়, অনেক জটিল পয়েন্ট রয়েছে। যে গণভোট নিয়ে তাদের এত আগ্রহ—সেই গণভোটের মূল বিষয়ই ভোটারদের বোঝানোর সুযোগ তারা পাবে না। তার ওপর গণভোটের দিনই সংসদ নির্বাচন। মানুষের ফোকাস থাকবে—তার এলাকায় কে জিতবে, কে হারবে। গণভোটে কোন অপশন জিতল বা হারল—এটা দিয়ে মানুষের সংসদ সদস্য নির্ধারিত হবে না। কাজেই গণভোটকে সাধারণ ভোটাররা তেমন গুরুত্বই দেবে না। এটাই বাস্তবতা। আমরা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অনেক বিশ্লেষণ করি, কিন্তু বাস্তবতা হলো—‘জুলাই সনদ’, ‘পিআর সিস্টেম’—এসব ব্যাপার সাধারণ মানুষের আগ্রহও বোঝার বাইরে।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতের এই আন্দোলনটা ছিল ভুল কৌশল। হয়তো তাদের ধারণা ছিল—অতীতের মতো আন্দোলন করতে করতে নির্বাচনের সময় এলে সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু অতীতে আন্দোলন করা হতো রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে। আর এখন যে সরকার ক্ষমতায়—এটা কার সরকার? এটি তো জামায়াত-বিএনপি–সমর্থিত সরকার। তাহলে নিজের সরকারের বিরুদ্ধে নিজেরাই আন্দোলন করলে সেটাকে মানুষ কিভাবে নেবে? একদমই জমবে না। আপনি সংগঠনের শক্তি দেখাতে পারেন কিন্তু জনসমর্থন পাবেন না।
মোস্তফা ফিরোজ মনে করেন, জামায়াত ভেবেছিল—একসঙ্গে সরকারকে ও বিএনপিকে চাপে ফেলবে, হয়তো জামায়াত বড় কোনো জোটে পরিণত হবে। কিন্তু আন্দোলনটি সঠিক ছিল না। বিএনপিও তাদের শতভাগ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, তবে জামায়াতের ক্ষতি বেশি হয়েছে। বিশেষ করে গণভোটকে যেভাবে তারা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছিল—‘নভেম্বরে না হলে হবে না’ সেই জায়গাটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এখন আর এটা জমবে না।