Thursday , 16 July 2026
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
প্রশাসনে জামায়াতের প্রভাব বিস্তার উদ্বেগজনক : নুরুল কবির
--বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল কবির

প্রশাসনে জামায়াতের প্রভাব বিস্তার উদ্বেগজনক : নুরুল কবির

অনলাইন ডেস্কঃ

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল কবির বলেছেন, জাতীয় রাজনীতিতে মূলধারার বড় দলগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অসংহত অবস্থানে ভুগছে, তখন তুলনামূলকভাবে সংগঠিত জামায়াতে ইসলামী প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দলটির সাংগঠনিক শক্তি তেমন না বাড়লেও, প্রশাসন ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের আধিপত্য সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশনের ‘তৃতীয় মাত্রায়’ অংশ নিয়ে নুরুল কবির এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালন করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান।

নুরুল কবির বলেছেন, গত বছরের জুলাই-আগস্টের পর অধিকাংশ মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন যে, দেশে ইতিবাচক কিছু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে। একটি নিয়ম-নীতিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে, ভোটাধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন অনুযায়ী বাংলাদেশ এক ধরনের সমতাভিত্তিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে—এমন আশাই জন্ম নিয়েছিল। এই সরকারের প্রতি মানুষের ছিল অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা ভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।

যে তরুণ শিক্ষার্থীরা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল আজ তাদের আচরণ, সরকারের পারফরম্যান্স, আইন-শৃঙ্খলার অনুন্নয়ন এবং নতুন করে দুর্নীতির নানা অভিযোগ সমাজে আলোচিত হওয়ায় এক ধরনের নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে।তিনি বলেন, যখন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার পতিত হয় তখন নতুন সরকার থেকে মানুষ স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা করে। মানুষ আশাবাদী হয়েছিল বিশেষত তখনই যখন এই সরকারের মন্ত্রীরা—এমনকি প্রধান উপদেষ্টা নিজেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে মন্ত্রীদের এবং তাদের স্ত্রী বা স্বামীদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ্যে জানানো হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

এক বছরের মাথায় উল্টো এই মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ভেতরেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।তিনি আরো বলেন, আন্দোলনকারী শক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং তাদের ঘনিষ্ঠদের পতিত সরকারের যেসব ব্যক্তি নানা অপরাধে যুক্ত ছিল তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করা হয়েছে এবং তাদের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আওয়ামী লীগ আমলের মতোই ভুয়া মামলা ও মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এসবের কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।

নুরুল কবির বলেন, একদিকে আমরা সরকারের মন্ত্রীদের সম্পদের কোনো প্রকাশ্য হিসাব দেখতে পাইনি, অন্যদিকে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে যে, তাদের অবৈধভাবে সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও সবার নয়, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই অভিযোগ উঠে এসেছে। এ কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা হলো—যে তরুণরা রাজনীতিতে এগিয়ে এসেছিলেন এবং সমাজে তাদের প্রতি এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছিল, তাদের আচরণ, চালচলন ও জীবনযাপনের কারণে এখন সেই আস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এক ধরনের হতাশার জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী মাহফুজ আলম যিনি একসময় ছাত্রনেতা ছিলেন, তিনি নিজের মন্ত্রিত্বের সময়কাল নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতেও পারছেন না। দুটি বিষয় এখানে প্রাসঙ্গিক—প্রথমত, তার মন্ত্রিত্বের পদ কেবলমাত্র আইনগতভাবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসই বাতিল করতে পারেন; দ্বিতীয়ত, তিনি চাইলে নিজেই পদত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। এতে বোঝা যাচ্ছে, এখানে চাকরিচ্যুতির প্রশ্নটি প্রচ্ছন্নভাবে রাজনৈতিক চাপের সঙ্গে জড়িত।

এই রাজনৈতিক চাপ কতটা এবং কোথা থেকে আসছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যমন্ত্রীর কিছু বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ, তরুণদের তৈরি করা এনসিপি নামের নতুন রাজনৈতিক দল এখনো পর্যন্ত কোনো ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেনি। ফলে তারা ভবিষ্যতে দেশকে কোন পথে পরিচালনা করতে চায়, তা অস্পষ্ট। তারা কী গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থী আদর্শে এগোবে, নাকি দক্ষিণপন্থী জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো দলের মতো নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে, নাকি বামপন্থার দিকে ঝুঁকবে—সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

এদিকে সংবাদমাধ্যমে এসেছে যে, এনসিপির নেতাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের প্রকাশ্য ও গোপন বৈঠক হচ্ছে। যদিও এসব গোপন থাকেনি। এই প্রেক্ষাপটে তথ্যমন্ত্রী তার ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। একটিতে তিনি স্পষ্টই বলেন—মওদুদীপন্থী চার-পাঁচটি দল সমাজে সক্রিয় আছে, তাই আরেকটি নতুন মওদুদীপন্থী দল গড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ বক্তব্য তিনি মূলত তার সহকর্মীদের উদ্দেশ্যেই দেন।

এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে চাপ, সমালোচনা ও নিন্দা বাড়তে থাকে। বিশেষত গত এক বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট বটবাহিনী তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়েছে। তাদের ইতিহাস ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে কেউ সমালোচনা করলেই তারা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে ট্যাগ দেয়। এসবের মধ্য দিয়েই তাদের সাংস্কৃতিক মান প্রকাশ পায়। সেই সব ফেসবুক পেজে আমরা দেখেছি, তথ্যমন্ত্রীকে টার্গেট করে ভীষণভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগ সমাজ থেকে সরে যাওয়ার পরও বিএনপি নিজেদেরকে একটি সুসংহত, সুসমন্বিত এবং সর্বোপরি একটি কমপ্রিহেনসিভ রাজনৈতিক মতাদর্শের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাদের কর্মীদের একটি বড় অংশ নানা জায়গায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখনো তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারেনি। তাদের রাজনৈতিক নেতারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তাদের কোনো সুসংহত রাজনৈতিক অবস্থান নেই। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে নতুন করে ‘উত্থান’ বলা না গেলেও, তারা প্রশাসন ও রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানের ওপর যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, সেটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের সংঘটিত আধিপত্য। যে কোনো মনোলিথিক পার্টির মতো তারাও তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত হয়ে উঠেছে এবং এর ফলস্বরূপ তাদের প্রভাব বর্তমান মন্ত্রীদের ওপরও পড়ছে।

নুরুল কবির বলেন, মন্ত্রীদের অনেকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত—এটা আগেও বলা হয়েছে, এমনকি কিছু নামও উল্লেখ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, প্রশাসন ও প্রধান উপদেষ্টার স্টাফদের ওপরও জামায়াতে ইসলামী ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে যেহেতু তথ্যমন্ত্রী মাহফুজ আলম জামায়াতের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন, তাই রাজনৈতিক চাপ যদি কোথাও থেকে আসে, প্রধানত সেখান থেকেই আসার কথা।

তিনি আরো বলেন, এখন বিএনপির জন্য সময় এসেছে নিজেদের জামায়াতের সঙ্গে জড়িত কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করার। একই সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোরও ভাবা উচিত—যারা দেশে সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়—তাদের জন্য উদ্বেগজনক যে, ইউনূস সরকারের আমলেই জামায়াত এমন ক্ষমতা দেখাতে পারছে যে তারা চাইলে মন্ত্রী পরিবর্তন পর্যন্ত চাপিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, যাদেরকে ইউনূস একসময় নিয়োগকর্তা বলেছিলেন, তাদেরই সরিয়ে দেওয়ার মতো আধিপত্য জামায়াত প্রশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এটি শুধু এক মন্ত্রীর জন্য নয় বরং তার সহকর্মী এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্যও গুরুতর বিষয়, যা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখার প্রয়োজন।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply