চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই চট্টগ্রাম নগরের সড়কগুলোর বেহাল দশা যেন নগরবাসীর দুর্ভোগের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকাগুলোর সড়কজুড়ে দেখা দিয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ ও বড় গর্ত। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন চালক, যাত্রী ও পথচারীরা। স্ট্র্যান্ড রোডের আনুমাঝির ঘাট এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় গর্ত ও উঁচু—নিচু ঢেউয়ের মতো অবস্থান তৈরি হয়েছে। ফলে, প্রায় সময়ই যানবাহনের গতি থমকে যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। অথচ মাত্র চার বছর আগে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়কটি সংস্কার করা হয়েছিল।
কিন্তু সংস্কারের দুই বছরের মধ্যেই সড়ক ভেঙে পড়তে শুরু করে। বর্তমানে আবারও ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু স্ট্র্যান্ড রোড নয়, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি সড়কের অবস্থা একইরকম খারাপ। অলিগলি থেকে শুরু করে নগরের প্রধান সড়কগুলোতেও চলাচল দুরূহ হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকে, যার ফলে পিচঢালাই উঠে গিয়ে গর্ত তৈরি হচ্ছে, তাতে গাড়ি চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নগরের বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকার চান মিয়া সওদাগর সড়কটির অবস্থাও ভয়াবহ। গত মঙ্গলবার সকালে দেখা যায়, সড়কে কার্পেটিংয়ের কোনো চিহ্ন নেই, সর্বত্র কাদাপানি আর গর্ত।
এই সড়কে ইট ফেলে কোনোরকমে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করেছে সিটি করপোরেশন। কালারপুল এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রুবেল বলেন, “সাত—আট বছর ধরে সড়কের এমন অবস্থা। বৃষ্টির সময় দোকানের সামনের কাদা ও পানি গাড়ির চাকায় উঠে মালামালে পড়ে। এতে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে গেছে।” নগরের পলিটেকনিক এলাকার আবদুল হান্নান সড়কের অবস্থাও শোচনীয়। গতকাল বুধবার দুপুরে মডেল স্কুল এলাকার গর্তে পানি জমে থাকার ফলে পথচারীদের হেঁটে চলাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাটহাজারী সড়ক, মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের বিভিন্ন অংশেও বড় বড় গর্ত দেখা গেছে।
এই রাস্তায় বেহাল দশার কারণে রাউজান, ফটিকছড়ি, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অক্সিজেন মোড়ের মৌসুমি ফল বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রতিবছর গর্ত তৈরি হয়, ইট—বালু দিয়ে ভরাট করা হলেও তা স্থায়ী হয় না। এতে ধুলাবালু উড়ে ব্যবসায় সমস্যা হয়।” শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বায়েজিদ বোস্তামী রোড, সিডিএ অ্যাভিনিউ, আবদুল হামিদ সড়ক, আমবাগান, শুলকবহর, জুবিলী রোড, কে বি আমান আলী রোডসহ অসংখ্য রাস্তায়ও একই দৃশ্য।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা দায় চাপাচ্ছেন ভারী বর্ষণ ও বিভিন্ন সংস্থার খেঁাড়াখুঁড়ির ওপর। তাঁদের দাবি, ওয়াসা, সিডিএ এবং অন্যান্য প্রকল্পের কারণে রাস্তা কাটার ফলে সড়ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপাতত গাড়ি চলাচলের উপযোগী করে ইট—সুরকি দিয়ে সংস্কার করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক স্বপন কুমার পালিত বলেন, “একটি সঠিকভাবে নির্মিত সড়ক সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর স্থায়ী থাকার কথা। কিন্তু নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, তদারকির অভাব এবং পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে অল্পদিনেই সড়ক বেহাল হয়ে যাচ্ছে।”
গত আট বছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছয়টি প্রকল্পে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও সেসবের দৃশ্যমান সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বরং প্রতিবছরই বর্ষা এলেই দুর্ভোগ বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, “এই দুরবস্থার মূল কারণ হলো জোড়াতালি সংস্কার ও দৃষ্টিনন্দন কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। বারবার গর্ত ভরাট করে কাজ শেষ না করে, টেকসই উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
