সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। ওই সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টারা বারবার দলমত-নির্বিশেষে নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তার বড় কারণ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে এমন কয়েকজন ছিলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার। বাস্তবে এই জনপ্রত্যাশা ও আশাবাদের বাস্তবায়ন যে হয়নি, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সার্বিক মানবাধিকার চিত্র খুব পরিষ্কার করে সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এ ছাড়া নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে মব সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের ব্যবহার, রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজারো মানুষের গ্রেপ্তার ও বিচারহীনভাবে আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধের নামে বাহিনীগুলোর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এবং হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও নির্যাতনে ১৭ মাসে ৬০ জন নিহত হয়েছেন। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের; এর মধ্যে রাজনৈতিক বন্দিও রয়েছেন।
তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সরকারি বাসভবনে বেশিদিন রাখতে চাইছে না গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের যেমন নীতিমালা রয়েছে, সাবেক উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রে সে রকম নীতিমালা নেই। তারা কোনো পেনশন সুবিধাও পান না। এ জন্য তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। আশা করা যায়, তারা সবাই চলতি মাসের মধ্যেই বাসা ছেড়ে দেবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কারো বিশেষ প্রয়োজন হলে হয়তো এক মাস সময় নেবেন। সে ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হবে। যেহেতু ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন হয়েছে। এই মাসের ভাড়া তাদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না।’
তথ্যমতে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চলতি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছেড়ে দেবেন। জুলাই আন্দোলনের পর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি সেখানেই থাকছিলেন। যমুনা ছেড়ে তিনি তার গুলশানের বাসভবনে উঠবেন।
জানা গেছে, তারেক রহমানের সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে ২৪টি বাংলো বাড়ি ও ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর বাইরে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য আরেকটি বাসভবন রয়েছে। সেগুলো দ্রুত মেরামত করে এক মাসের মধ্যেই বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের বরাদ্দ দিতে চায় আবাসন পরিদপ্তর।
বর্তমানে সেসব স্থাপনায় অবস্থান করা সাবেক সরকারের কর্তাব্যক্তিদের গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়েছে। আবাসন পরিদপ্তর আশা করছে, চলতি মাসে বাসাগুলো খালি হলে সেগুলো রংচং ও মেরামত করে পর্যায়ক্রমে নতুন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের বরাদ্দ দেওয়া হবে। মার্চের মধ্যেই এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
আবাসন পরিদপ্তর চেষ্টা করছে একই সঙ্গে সবাইকে বাসা বরাদ্দের। ইতিমধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ২১ জন বাসার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। কিন্তু কাকে কোন বাসা বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও আবাসন পরিদপ্তরের শীর্ষদের নিয়ে বৈঠক করেছেন।
পরে আবেদনগুলো গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের দপ্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। আবেদনকারীরা কোন বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে আগ্রহী, সেটি তাদের সরেজমিন পরিদর্শন করে মন্ত্রীর দপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। আবেদনকারীদের কয়েকজন পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ৪৯ জন। এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা-বিশেষ সহকারী আছেন আরো ১০ জন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন একজন।
মন্ত্রী মর্যাদায় বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপও রয়েছেন। পাশাপাশি মন্ত্রী মর্যাদায় সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় হুইপও থাকবেন একাধিক। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়ার মতো মোট বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট আছে ৩৭টি। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য আপাতত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে দেওয়া হবে।
জানা গেছে, এ তালিকায় খোদ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুরও রয়েছেন।
এ অবস্থায় সবার আবাসনের ব্যবস্থা আবাসন পরিদপ্তর করতে পারবে কি না–সে প্রসঙ্গে পরিদপ্তরের পরিচালক বলেন, সবাই তো আর সরকারি বাসা বরাদ্দ চাইবেন না। কাজেই সেটা সমস্যা হবে না।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
