দিনকে দিন হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ। ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ নানা স্বার্থে এই হিংস্রতার প্রতিফলন ঘটানো হচ্ছে। সৃষ্টি করা হচ্ছে মব ভায়োলেন্স। যেমন দুই দিন আগে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে পৈশাচিক কায়দায় জনসমক্ষে পোড়ানো হয়েছে।
তিনি ভালুকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস নামে একটি পোশাক কারখানার কর্মী ছিলেন। তাঁর তিন বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে। শুধু হিংস্রতার কারণে এভাবে আইন ও বিচারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিচারহীনতার কারণেই হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখনই এসব শক্তভাবে প্রতিরোধ করা না গেলে তা ছোঁয়াচে রোগের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত এক বছরের হিসাবে আগস্ট-২০২৪ থেকে জুলাই-২০২৫ পর্যন্ত ১৯৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে মব সৃষ্টি করে। মানুষ, বিড়াল, কুকুর; পশু-পাখি কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না মানুষের হিংস্রতা থেকে।
এ সময়ে শুধু ঢাকা বিভাগেই মবের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৯২ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পত্রিকা, সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা হিংস্রতার সর্বশেষ ঘটনা। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো আতঙ্ক ছড়াচ্ছে মানুষের মধ্যে। অনিরাপদ বোধ করছে সাধারণ মানুষ। দৈনন্দিন জীবনযাপনে এর প্রভাব বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘নির্বাচনের এই সময়টায় আমাদের আসলে যতটুকু শক্ত হওয়া প্রয়োজন আমরা চেষ্টা করছি। দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে অপরাধ দমনে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি অপরাধ দমনে এবং উদ্ধার কার্যক্রমে। গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরেও অনেক সময় অপরাধ আটকানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ আমরা যে ফোর্স মোতায়েন করি, তার থেকে ১০ গুণ-২০ গুণ লোক চলে আসে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক লোক জমা করে ফেলার যে কালচার শুরু হয়েছে, আমাদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ।’ সমাজে বিচারহীনতা মানুষকে হিংস্র হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে এখন নানা বিচারহীনতার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে অপরাধী কিন্তু চিন্তা করে তাকে কতটুকু ফলাফল পেতে হবে। যখন অপরাধ করে পার পাওয়া যাচ্ছে, কোনো প্রকার বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না, তখন সে হিংস্র হয়ে উঠবেই। এভাবে চলতে থাকলে অপরাধ ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়বে। বারবার অপরাধ করতে থাকলে আশপাশের সাধারণ মানুষও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। তখন চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়ে যেতে পারে। সুতরাং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিচারের কোনো বিকল্প নেই। কোনো একটি ঘটনার বিচার মানে শুধু ওই ঘটনার বিচার নয়, বরং এটি একটি বার্তা হিসেবে কাজ করে এবং প্রভাব ফেলে অন্য সবার মাঝে। ফলে বিচারের কোনো বিকল্প নেই।কলামিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বিজ্ঞানী ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ এখন বিভিন্ন ইস্যুতে নেতিবাচক কমেন্ট করে গালাগালি করে। হত্যার হুমকি, হত্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। মব ভায়োলেন্স বা মব জাস্টিসের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে অবমাননা, মারধর, হত্যা বা সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। উচ্ছৃঙ্খল লোক আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। মব জাস্টিসে কখনোই ন্যায়বিচার হয় না। এ ধরনের মব বা গণপিটুনি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণেরও সুযোগই পান না।