জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের মধ্যে ৬২ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে, জুলাই সনদের কয়েকটি সাংবিধানিক প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সংস্কার
গত ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, আর এর বিপরীতে ‘না’ ভোট দিয়েছেন দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে বলা হয়েছে গণভোটের কথা। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে। জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধ রাজপথ পর্যন্ত গড়ায়।
শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবির মুখে সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্তের কথা জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন সংস্কার বাস্তবায়নের তৃতীয় স্তর শুরু হবে।
আগামী মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে গঠিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, যা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তৈরি হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে এই পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সংস্কার পরিষদ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর দিন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, নবনির্বাচিত সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ নিতে হবে—একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। তিনি আরও বলেন, সংস্কার পরিষদের কার্যকাল হবে ১৮০ দিন।
সংবিধান পরিবর্তন
গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়ের ফলে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নের পথ খুলেছে, তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব হলো প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। এ ছাড়া সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে।
জুলাই সনদের ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। এ বিষয়গুলোতে বিএনপির আপত্তি নেই।
জুলাই সনদে আরো বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এই প্রস্তাবে প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজী হয় বিএনপি। যে কারণে বিএনপি নির্বাচনের আগে তাদের ইশতেহারে বিষয়টি স্পষ্টও করেছে। বিএনপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদই হোক তিনি সর্বোচ্চ দশ বছরের বেশি অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। যে কারণে তারা সেই বিষয়টি ইশতেহারেও যুক্ত করেছে। ফলে দলীয় প্রধান আর প্রধানমন্ত্রী একই পদে থাকা নিয়ে জুলাই সনদে সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
আইনজীবী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশেই বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক দল বিজয় লাভ করবে তার ইশতেহার অনুযায়ী সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যে কারণে বিএনপির যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো তারা বাস্তবায়নে বাধ্য নয়। সেগুলো তারা ইশতেহারেও উল্লেখ করেছে’।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব কার্যকর হলে রাষ্ট্রপতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিজ বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
অন্যদিকে, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধানে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উপ-রাষ্ট্রপতিও রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন। যদিও জুলাই সনদে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। তবে সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন সংবিধানে এ বিধান যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উচ্চকক্ষ নিয়ে নানা প্রশ্ন
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় যুক্ত করেছে। কিন্তু চারটি প্রশ্ন থাকলেও সেখানে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ একটিতে ভোট দিতে হয়েছে ভোটারদের। যে কারণে শুরু থেকেই এটি নিয়ে নানা ধোঁয়াশা ছিল।
গণভোটের ওই চারটি প্রশ্নের ‘খ’ প্রস্তাবে আনুপাতিক উচ্চকক্ষের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।’
পরের প্রশ্নে আবার বলা হয়েছে, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
সর্বশেষ প্রশ্নে বলা হয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি এককভাবে ২৯০ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত এককভাবে ২২৭ আসনে নির্বাচন করে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। তবে জোটবদ্ধ ভোটের হিসেবে বিএনপি ৫১ শতাংশের বেশি ও জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আবার আসন সংখ্যার হিসেবে বিএনপি জোট ২১২টি এবং জামায়াত- এনসিপি জোট জিতেছে ৭৭টি আসন।
এখন আসন সংখ্যার হিসেবে যদি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিএনপি জোট ১০০টির মধ্যে ৭০টি, জামায়াতে ইসলামী অন্তত ২৬টি, এনসিপি ২টি আসন পেতে পারে। এর বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারের বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠন হলে বিএনপি জোটের আসন কমে হবে ৫২ থেকে ৫৩ টি, আর জামায়াত জোটের অন্তত ৩৮টি।
জুলাই সনদে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন ভোটের আনুপাতিক হারে নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হলেও বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল। অন্যদিকে, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করে, ক্ষমতায় গেলে তারা সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এই দ্বৈত অবস্থানকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের দিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিবিসি বাংলাকে জানান, গণভোটের ব্যালটে চারটি ক্যাটাগরি ছিল এবং সেখানে উচ্চকক্ষের গঠন আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে হবে কি না—সে বিষয়ে সরাসরি ভোট নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠিত হবে।
মনির হায়দারের ভাষ্য, ‘উচ্চকক্ষের বিষয়ে ব্যালটে ভোটাররা সরাসরি মত দিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির ইশতেহার গণভোটে অনুমোদিত হয়নি।’ তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, গণভোটে সরাসরি অনুমোদিত একটি প্রস্তাব এবং কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে পরোক্ষভাবে ঘোষিত আরেকটি প্রস্তাব—এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে?
তবে বিষয়টি নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আলোচনা ও বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলে অন্তর্বর্তী সরকার ও সংবিধান বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
