সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক গোলাম মাওলা রনি বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মাসের যে বিপ্লব, যেটি পূর্ণতা পেয়েছিল আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে। সেই বিপ্লব এক বছরের মাথায় এসে বেহাল দশায় পড়েছে, যেটি আমরা সেই বিগত ছয় মাস আগেও কল্পনা করিনি।’ আজ শুক্রবার (১ আগস্ট) নিজের ইউটিউব চ্যানেলের এক ভিডিওতে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘আমাদের বাঙালি জীবনে বিপ্লব একটি দুর্লভ বিষয়।
কিছুদিন আগে ইরান এবং ইসরাইলের যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের যে ধর্মীয় নেতা তিনি একটা অসাধারণ এবং অপূর্ব একটা ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এই কথাটাই বলেছিলেন যে, ফ্রেন্স রেভুলেশনের প্রেক্ষাপটে যে শব্দমালা রচিত হয়েছে— বিপ্লব বিপ্লবীদের খেয়ে ফেলে। ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব হয়েছে, এই বিপ্লব যেন বিপ্লবীদের খেতে না পারে। এজন্য প্রথম থেকেই বিপ্লবের মাস্টারমাইন্ড আয়াতুল্লাহ খামেনী প্রথম থেকেই তার মিলিটারি তার সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, তার সামাজিক কাঠামো, তার শরিয়া আইন সব জায়গাতে তিনি বিপ্লবের যে স্প্রিটটি ধারণ করেছেন, সেই স্পিরিটটি এখন পর্যন্ত চলমান। ফলে ইরানের বিপ্লব বিপ্লবীদের খেতে পারেনি কিন্তু আমাদের বিপ্লব কীভাবে বিপ্লবীদের খেয়ে ফেলছে, এটা আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই বিপ্লবের স্বর্ণের রাজপুত্র; আমরা তাদেরকে স্বর্ণ মানব হিসেবে অভিহিত করতাম। ২০২৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস পর্যন্ত। এখন তাদেরকে কেউ বলছে চাঁদাবাজ,গুন্ডাবাজ, ধর্ষক এবং কেউ বলছে ইফটিজার । কারো বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ, কারো প্রেমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কারো প্রেমিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ। তাদের মধ্যে বন্ধন ছিহ্ন হয়ে গেছে, মারামারি হচ্ছে, কাটাকাটি হচ্ছে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে খিস্তি খাওড় করতে গিয়ে পুরো বিপ্লব; জুলাই আগস্ট বিপ্লবটিকে এক বছরের মাথায় এসে এমন একটা বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে কি হলো? না বিপ্লব, না গণতন্ত্র, না ফ্যাসিবাদ না ধর্মতন্ত্র, না ইউনুসতন্ত্র, না গ্রামীণ ব্যাংকতন্ত্র কিংবা যেটিকে আমরা প্রথম দিকে ঠাট্টা করে বলতাম যে—এখানে চট্টগ্রাম এর আঞ্চলিকতা গ্রামীণ ব্যাংক এবং থ্রি জিরো থিওরি একত্র একটা সরকার জগা খিচুড়ি সরকার করেছে সেটাও এখন নেই। সরকার কে চালাচ্ছে? সরকার কোথায় চলছে, ছাত্রজনতা কি করছে? সমন্বয়করা কি করছে? এনসিপিরা কি করছে? এবং এই সময়ের মধ্যে বারবার শুধু পরিবর্তন হচ্ছে। ছাত্রজনতা থেকে পুরো যে ক্ষমতা সেটা চলে আসলো সমন্বয়কদের কাছে। সমন্বয়কদের পুরো ক্ষমতা চলে আসলো সরকারের কাছে। সরকারের মধ্যে আবার ক্ষমতায় ভাগ বসালো এনসিপি। এনসিপির মধ্যে ভাগ বসালো জামায়াত। জামায়াতের সাথে ক্ষমতার ভাগ বসালো বিএনপি এবং যখন এই ভাগাভাগি হচ্ছিল— প্রথম তিন চার মাসে কোন গন্ডগোল হয়নি। আর এখন সবাই সবার বিরুদ্ধে লেগে গেছে। যে দহরম মহরম সম্পর্ক ছিল জামাতের সঙ্গে এনসিপির সেই দহরম মহরম সম্পর্ক এখন অহি-নকুল সম্পর্কে পরিণত হয়েছে।
এনসিপির নেতারা বলার চেষ্টা করছেন যে, তাদের এই বিপ্লবের পেছনে বা গণঅভ্যুত্থানের পেছনে শিবিরের কোন ভূমিকা ছিল না। শিবিরের ডাকে কেউ আসেনি। শিবির বলার চেষ্টা করছে—ওরা কারা, সমস্ত লজিস্টিক সাপোর্ট আমরা দিয়েছি, আমরা শুধুমাত্র ওদেরকে হুকুম দিয়েছি আর ওরা সেটা ঘোষণাপত্র শুধু পাঠ করেছে ডিড ইট নাথিং। গোপন জায়গা থেকে আমাদের বক্তব্য তারা শুধু পাঠ করেছে আর যা কিছু করার জামাত এবং শিবির করেছে। আর এতে অপমানিত হয়ে বিপ্লবের গণঅভ্যুত্থানের গণজাগরণের যারা নায়ক এক বছরের মাথায় এসে তারা বলার চেষ্টা করছেন যে, নো; এই বিপ্লবে শিবিরের ডাকে কেউ আসেনি। শিবির ভিন্নভাবে; জামাত ভিন্নভাবে; অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মত কিছু একটা করে থাকতে পারে। কিন্তু তাদের নেতৃত্বে বিপ্লব সংগঠিত হয়নি। গণঅভ্যুত্থান হয়নি। আর তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে লোকজন রাস্তায় নামেনি। ফলে কি হলো? সবকিছু এক বছরের মাথায় এসে তছনছ হয়ে গেছে। আমরা যারা সাধারণ জনগণ, যারা এই বিপ্লবকে নিয়ে ভীষণ রকম আশাবাদী ছিলাম। আমাদের সেই আশা এখন রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। এ আতঙ্ক যেন আর না বাড়ে। আমরা যেন একটা সঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফিরে আসতে পারি এবং আমাদের যে অধিকার সে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আমাদের প্রার্থী প্রতিনিধি আমরা মনোনীত করতে পারি ভোটের মাধ্যমে। এরকম একটি ব্যবস্থা খুব দ্রুত কায়েম হোক এই প্রত্যাশা রাখছি।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
