১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। চারটি প্রশ্ন নিয়ে এ গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে সরকার গণভোটে যেন জনগণ ‘হ্যা’ ভোট দেয় সেজন্য প্রচার চালাচ্ছে। উপদেষ্টারা গণভোটে হ্যাঁয়ের পক্ষে জনমত তৈরি করতে জেলায় জেলায় সফর করছেন।
যুক্তরাজ্য (২০১৬) : প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিট গণভোটে ‘থাকুন’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালান এবং ইইউ সদস্যপদ বজায় রাখাকে জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন।
স্কটল্যান্ড (২০১৪) : ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যালমন্ড ‘ইয়েস স্কটল্যান্ড’ প্রচারে ছিলেন প্রধান মুখ এবং গণভোটকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গণতান্ত্রিক সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তুরস্ক (২০১৭) : প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালান।
কিরগিজস্তান (২০১৬) : প্রেসিডেন্ট আলমাজবেক আতামবায়েভ সংসদীয় ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ফ্রান্স (১৯৬২) : প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য গণভোটের পক্ষে সরাসরি জনগণের সমর্থন চান সংসদীয় বিরোধিতা উপেক্ষা করে।
এসব ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকারপ্রধানদের সমর্থনকে অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি। বরং এটিকে রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে-নেতারা যা সঠিক মনে করেন, তার পক্ষে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। এর আগে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল গণভোটে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছি এটা সংস্কারের প্রতি আমাদের যে কমিটমেন্ট, সেই কমিটমেন্ট থেকেই করা হয়েছে। আমরা প্রথম থেকে বলেছি আমরা চাই বাংলাদেশে অনেক সংস্কার হোক। যেটা আমাদের পক্ষে করার কথা সেগুলো আমরা করছি। যেই সংস্কারটা আমরা করতে পারব না, যেটার জন্য সংবিধান পরিবর্তন লাগে, সেটা আমরা গণভোট দিয়েছি, আমরা লোকের কাছে আপিল করছি। আমরা তো প্রথম থেকে কোনো ভানভণিতা করছি না। আমরা সংস্কারের পক্ষে।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে বাংলাদেশে যত গণভোট হয়েছে, সব সময় সরকার একটা পক্ষ নিয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে কোনো নতুন সরকার গঠিত হয় না।’ তারপরও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তারা বলছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের জন্য ইসি ডিসি ও ইউএনওদের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে সরকারি গ্যাজেটে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত এই কর্মকর্তারা ইসির নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় কাজ করেন; সরকারের অধীনে নয়। এই সময়ে ইসির অনুমোদন ছাড়া সরকার তাদের বদলি করতে পারে না এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে তা ‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১’-এর অধীনে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। একবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য নির্বাচনি আচরণবিধি বর্তমান প্রচার ও গণভোটের জন্যও প্রযোজ্য।
এ জায়গাটায় আরও গভীর আইনি জটিলতা তৈরি হবে বলে মনে করেন এই আইনজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী নির্বাচনের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারাই পদাধিকারবলে গণভোট পরিচালনার কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য হবেন। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার পর উভয় প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে তাঁরা আইনত বাধ্য। অথচ কর্মকর্তাদের একটি ‘সচেতনতামূলক’ প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকার, যেখানে সুস্পষ্টভাবে প্ররোচনামূলক বার্তা রয়েছে। যেমন সব সংস্কার বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোট দিন; না ভোটে কিছুই মিলবে না। পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, ‘নির্বাচনে সরকারের নিউট্রাল থাকার কথা। সরকার কোনো পক্ষে প্রচার চালাতে পারে না। কিন্তু তারা একটা পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার। এটা বেআইনি।’ তিনি বলেন, ‘আইনি-বেআইনির দাম তো এই সরকারের কাছে নেই। যাদের নিউট্রাল থাকার কথা, মানে সরকারের নিউট্রাল থাকার কথা, কিন্তু তারা নিউট্রাল থাকছে না। নির্বাচনে প্রচার চালানোর কথা ২২ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু তারা একটা পক্ষে এরই মধ্যে প্রচার শুরু করেছে। এটা ক্লিয়ার ভায়োলেশন। সরকার জনগণের টাকায় হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। এটা একদম অনৈতিক।’ কারণ জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘জনগণের টাকায় সরকার প্রচার চালাচ্ছে, সেখানে না-সমর্থকের টাকাও তো আছে। তার মানে তার টাকায় তার বিরুদ্ধেই প্রচার চালাচ্ছে সরকার। তারপর শিক্ষক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের হ্যাঁ-ভোটের প্রচার করতে বলেছে সরকার। কিন্তু ভোটের দিন তাদের দিয়েই নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণ করার কথা।’ জুলাই জাতীয় সনদ প্রকাশ করেছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। এতে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি দলের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন না করা, সংবিধানে গণভোটের বিধান চালু করা, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবে না, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভারসাম্য সৃষ্টি, অপরাধীদের রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না-এ রকম ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওইসব প্রস্তাবসহ জুলাই সনদে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৬টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। যদিও বিএনপি ৯টি প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছে। তবে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দল এতে সই করেনি।
গত ২৮ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কিত সুপারিশ অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করার সুপারিশ করে কমিশন। জাতীয় নির্বাচনের দিন বা তার আগে গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে বলে কমিশন মত দেয়। এরপর গত বছরের ২৯ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের কাছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ জমা দিয়েছে, তাতে অনেক অসংগতি রয়েছে বলে সমালোচনা করে বিএনপি। দলটির নেতারা ওই সময়ে বলেন, ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত হয়নি বা ঐকমত্য হয়নি এমন বিষয়ও এতে সংযুক্ত করা হয়েছে। এসব বিতর্ক এড়িয়ে সরকার গণভোটের আয়োজন করতে যাচ্ছে।
মোট চারটি প্রশ্নের ওপর গণভোট হচ্ছে। সেগুলো হলো :
আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। গণভোটের দিন এ চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মত জানাবেন। এ প্রশ্ন নিয়েও জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানান বিভ্রান্তি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গণভোটের চারটি প্রশ্নের কোনো একটির সঙ্গে দ্বিমত থাকলে সেখানে ‘না’ বলার সুযোগটা কোথায়?
এসব বিতর্ক আর প্রশ্ন নিয়েই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে একটি গণভোটের দিকে। প্রশ্ন হলো, গণভোটে কি জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে?
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
