১৭ এপ্রিল ১৯৭১—মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় এক আমবাগানে শপথ নেয় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার।
শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেলে। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন মেহেরপুরে তাৎক্ষণিকভাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে।
সেখানে তিনি বলেন, ‘সমবেত সাংবাদিক বন্ধুগণ এবং উপস্থিত জনসাধারণ, আপনাদের সামনে আমার মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রীকে আপনাদের সামনে সর্বপ্রথমে উপস্থিত করছি।
২০১৯ সালে চৌধুরীর সাথে যখন বিবিসি বাংলার কথা হয়, সেই সময় তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের নানা খুঁটিনাটি কথা।
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর কাছে প্রশ্ন ছিলো যে বৈদনাথতলার ওই স্থানটিকে বাছাই করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো আমলে নেওয়া হয়েছিল?
জবাবে তিনি বলেন, এমন একটি জায়গা বাছাই করতে বলা হয়েছিল যেখানে ভারত থেকে সহজেই ঢোকা যায়, যে এলাকা শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে – বিশেষ করে আকাশ থেকে এবং বাংলাদেশের দিক বিবেচনা করলে একটু যেন দুর্গম হয়।
‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তী নামে বিএসএফের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বৈদ্যনাথতলার আমবাগানটি বাছাই করা হলো। সেখানে আমবাগান থাকায় আকাশ থেকে সহজে দেখা যায় না। মেহেরপুর থেকে ১০/১২ কিলোমিটার দূরত্বে হলেও রাস্তাঘাট নষ্ট থাকায় সহজে যাওয়া যায় না। আবার ভারত থেকে সহজেই সেখানে প্রবেশ করা যায়।’
তিনি বলেন, পুরো বিষয়টির আয়োজন করা হয়েছিল খুবই গোপনে।
‘কী হবে সেটা কাউকে বলিনি। তখন আমাদের সীমান্ত এলাকায় রেগুলার ইপিআর নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই সঙ্গে আনসারের একটি ছোট কন্টিনজেন্ট রেখেছিলাম – সীমান্তের প্রতীকী নিরাপত্তার জন্য।’
চৌধুরী বলেন, ‘তাদের কাছে গিয়ে আমরা বললাম যে, ভারতের দিক থেকে কয়েকজন লোক আসতে পারে। এখানে একটা জায়গায় অনুষ্ঠান হতে পারে, তোমরা তাদের সাথে যোগাযোগ রেখো এবং যা বলে করো। পরে খবর পাঠানো হলো যে ১৭ এপ্রিল তোমরা প্রস্তুত থেকো।’
ওই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে পিছু হটে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার কৃষ্ণনগরে পৌঁছেন মাগুরার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ওয়ালিউল ইসলাম এবং পাবনার প্রশাসক নুরুল কাদের। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের খবর তাদের কাছেও পৌঁছেছিল, বলছেন ওয়ালিউল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘তখন মেজর ওসমান চুয়াডাঙ্গা থেকে তার হেডকোয়ার্টার মেহেরপুরে নিয়ে গেছেন। চুয়াডাঙ্গায় কিছু বোমাবর্ষণ হওয়ায় তারা জায়গা বদল করেছেন। ওখানে দুই দিন থাকার পরে আমরা যখন ভারতে প্রবেশ করি, তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে।’
‘সেখান থেকে আমরা কৃষ্ণনগরে গেলাম – এটা ১৬ তারিখের কথা। নুরুল কাদের আমাকে বললেন, তুমি কাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চলে এসো, কিছু কাজ আছে।’
‘আমি সাড়ে ৮টা-পৌনে ৯টার দিকে গেলে তিনি বললেন, নদীয়ার ডিএম (ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট) খুঁজছে, তুমি একটু কথা বলো। আমি ফোন করলে তিনি বললেন, দেখুন আমাদের কাছে খবর আছে, আমাদের কাছাকাছি বাংলাদেশের ভেতরে আপনাদের সরকার শপথ নেবে। তো, আপনারা যারা এখানে আছেন, তাদের পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য আমি অনুরোধ পেয়েছি’,বলছেন ইসলাম। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে সকালে।
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী জানান, ‘স্থান নির্বাচনের পর তাদের অনুষ্ঠান আয়োজনের যাবতীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলো। সেখানে আমরা ছোট একটা মঞ্চের মতো ব্যবস্থা করলাম। কাছাকাছি ভবেরপাড়ার একটি মিশনারি হাসপাতাল থেকে কিছু চেয়ার টেবিল ধার করে নিয়ে আসলাম। ভারতীয় আর্মির কিছু লোককে যেতে দেয়া হলো, যাতে কোন বিমান হামলা হলে সেটাকে দমন করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকজনকে নিয়েও একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলো, যাতে শত্রু আক্রমণ করলে প্রতিরোধ করে সবাই নিরাপদে চলে যেতে পারেন।ওই সময় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গ্রামেগঞ্জে খুবই সীমিতভাবে আয়োজন করতে হয়েছিল।’ সকাল ৯টার সময় থেকে অনুষ্ঠানস্থলে আমন্ত্রিত অতিথিদের আসা শুরু হয়।
কৃষ্ণনগর থেকে সেখানে গিয়ে ওয়ালিউল ইসলাম দেখতে পান, বৈদ্যনাথতলায় একটি মঞ্চ বানানো হয়েছে। মঞ্চে সাতটি বা আটটি চেয়ার ছিল, যার একটি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য খালি ছিল।
সেখানে ‘ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ পাঠ করলেন গণপরিষদের স্পিকার ইউসুফ আলী। তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
‘এরপর আমরা ভেবেছিলাম ইপিআরের লোকজনকে দিয়ে একটা গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। কিন্তু মেজর ওসমানসহ ইপিআরের লোকজন তখনো সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। তখন আমি বিকল্প সমাধান খুঁজতে বাধ্য হলাম’, বলছিলেন তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
‘সেখানে আনসারের যে লোকজন ছিল, তাদের একত্রিত করে আমার বন্ধু মাহবুব – যে ঝিনাইদহের এসডিও ছিল। যেহেতু তার গার্ড অব অনার দেয়ার প্রশিক্ষণ রয়েছে, তখন তাদের নিয়ে একটি রিহার্সাল দেয়া হলো। এরপরে তারাই গার্ড অব অনার দিলেন।’
তখন সেখানে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদেরও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং উপস্থিত অভ্যাগতদের সঙ্গে।
ওয়ালিউল ইসলাম বলছেন, “গার্ড অব অনারের পর তৌফিক এসে বললো, ‘আপনারা যারা মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদেরকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই’। তখন আমরা সাত অথবা আটজন দাঁড়ালাম। বাকিরা সবাই সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট বা ক্যাপ্টেন পদের কর্মকর্তা ছিলেন। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো যে আমি একজন প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা।”
অনুষ্ঠানটি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী জানাচ্ছেন যে গোটা সময়টা জুড়ে তার মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছিল।
‘সব সময়ে একটা ভয় ছিল কোন কারণে যদি পাকিস্তান আর্মি আক্রমণ করে বসে! তবে একটা আশার কথা ছিল যে, ওখানে আসতে হলে ভারতের আকাশসীমা হয়ে আসতে হয় – না হলে বিমান ঘুরতে পারে না। তাই একটা চেষ্টা ছিল যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবকিছু শেষ করে চলে যাওয়া। অনুষ্ঠানটি দীর্ঘায়িত করার কোন পরিকল্পনা ছিল না।’
আমবাগানের ঘন পাতার আচ্ছাদনে আড়াল করা ওই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তার ভাষণে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্যে যে, তারা আমাদের আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি দেখে যাওয়ার জন্য বহু কষ্ট করে, বহু দূর দূরান্ত থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন।’
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, সেদিন অনুষ্ঠানে অন্ততপক্ষে একশো’ সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন, আর তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক বিদেশী সাংবাদিক।
ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম বাংলাদেশের যে সরকার গঠন করা হয়েছিল, ১৭ এপ্রিল সেই সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার লড়াই একটা অঙ্গীকার পেয়েছিল।
‘আমি সেখানে একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম, এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, পাকিস্তানিরা কখনোই এখানে জয়লাভ করতে পারবে না। সরকার গঠন হওয়ায় আমি এটাকে একটা পজিটিভ দিক হিসাবে দেখেছি যে এর ফলে আমরা আনুষ্ঠানিকতা পেলাম, একদিন স্বাধীন আমরা হবো’, বলছিলেন ওয়ালিউল ইসলাম। সেদিন ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলো মেহেরপুরের একটি অখ্যাত আমবাগান।
তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘ওই আমবাগানটা খুব ঘন আমবাগান। অনেক পুরনো আমগাছ – গাছে গাছ লেগে ছাতার মতো হয়ে থাকে। দিনের আলো ঝিলমিল করছিল, আনন্দঘন উৎসবের মতো লাগছিল। মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন এটাকে সমর্থন দিচ্ছে, আর রূপকথার মতো অনুষ্ঠানটা শেষ হলো।’
‘অজপাড়াগায়ের একটি পল্লী – যে আমবাগানে কখনো কিছু হতো না – সেখানে একটা দেশের সরকারের প্রথম শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। আমারা সবাই যখন চলে গেলাম, তখন যেন রূপকথার রাজকন্যাকে সোনার কাঠি দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হলো।’
(এই প্রতিবেদনটি বিবিসি বাংলায় প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৭ এপ্রিল ২০১৯ সালে)
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
